08/10/2026 বিএমইটিতে দুর্নীতির ‘গডফাদার’ মাসুদ রানা
নিজস্ব প্রতিবেদক
৯ আগস্ট ২০২৬ ১৯:০৬
লাখো প্রবাসী শ্রমিকের ঘাম ও রক্ত পানি করা উপার্জনে ভাগ বসিয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোকে (বিএমইটি) দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) এবং বর্তমান পরিচালক (কর্মসংস্থান) মো. মাসুদ রানা। জ্যেষ্ঠ সহকর্মীদের ডিঙিয়ে অবৈধ ক্ষমতার জোরে পদে বসা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে হাজার কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।
প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে চালানো এসব নজিরবিহীন অনিয়ম, ঘুষ-দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং অর্জিত অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শরণাপন্ন হয়েছেন ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংক্ষুব্ধ নাগরিকরা। সম্প্রতি দুদক চেয়ারম্যান বরাবর পেশ করা এক সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগে মাসুদ রানা ও তাঁর পরিবারের গড়ে তোলা এই প্রকাণ্ড সাম্রাজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগের অনুলিপি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), সিআইডি এবং এনএসআইসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের সংস্থাগুলোতে পাঠানো হয়েছে।
---
পরিসংখ্যান কর্মকর্তা থেকে দুর্নীতির ‘একচ্ছত্র গডফাদার’
বিএমইটি সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মাসুদ রানা মূলত একজন সাধারণ পরিসংখ্যান কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের (যেমন সাবেক সচিবের ছত্রছায়ায়) সঙ্গে অনৈতিক সখ্য গড়ে তুলে তিনি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়মবহির্ভূতভাবে ডিঙিয়ে বিএমইটির অন্যতম প্রভাবশালী পদ ‘পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ)’ বাগিয়ে নেন।
জাতীয় গণমাধ্যমে তাঁর এই লাগামহীন দুর্নীতির চিত্র প্রকাশিত হলে বিএমইটিজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। তীব্র সমালোচনার মুখে বিএমইটির মহাপরিচালক (ডিজি) তাঁকে ‘পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ)’ পদ থেকে সরিয়ে ‘পরিচালক (কর্মসংস্থান)’ পদে বদলি করলেও প্রশাসনিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তাঁর গড়ে তোলা পুরোনো সিন্ডিকেট এখনো সমানভাবে সক্রিয় রয়েছে।
---
দেশে-বিদেশে হাজার কোটি টাকার সম্পদের পাহাড়
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগ ও অনুসন্ধানে মাসুদ রানা এবং তাঁর স্ত্রী উম্মে ছালমা শেখের নামে-বেনামে অর্জিত যে বিশাল সম্পদের তথ্য মিলেছে, তা রীতিমতো চোখ কপালে তোলার মতো:
১. রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট: গুলশান, নিকেতন, ধানমন্ডি এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার মতো চড়া দামের অভিজাত এলাকাগুলোতে মাসুদ রানা ও তাঁর স্ত্রীর নামে একাধিক সুউচ্চ ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে।
২. উত্তরায় বহুতল ভবন ও জমি: রাজধানীর উত্তরার প্রাণকেন্দ্রে দুটি বহুতল আবাসিক ভবন এবং সাভার ও আশপাশের এলাকায় শত শত শতাংশ মূল্যবান জমি ও প্লট রয়েছে তাঁর।
৩. গ্রামে কোটি টাকার মার্বেল প্রাসাদে অট্টালিকা: নিজ জেলা নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ উপজেলার চানপুর গ্রামে শত শত শতাংশ জমির ওপর নির্মাণ করেছেন এক দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকা, যেখানে কোটি কোটি টাকার মার্বেল পাথর ও রাজকীয় ফিটিংস ব্যবহার করা হয়েছে।
৪. মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’: অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাচার করে তিনি ‘মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম’ (MM2H) প্রকল্পের আওতায় সেখানে অঢেল অর্থ বিনিয়োগ করে সাম্রাজ্য বিস্তার করেছেন।
৫. দুবাইয়ে স্বর্ণ ও জনশক্তি ব্যবসা: সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে এক রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বে বহুতল ভিলা ক্রয়সহ সরাসরি স্বর্ণ ব্যবসা ও ম্যানপাওয়ার খাতে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন।
---
টিটিসির অধ্যক্ষদের জিম্মি করে রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও বদলি বাণিজ্য
বিএমইটির প্রশাসনিক পদে থাকাকালে সারাদেশের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর (টিটিসি) অধ্যক্ষ ও কর্মকর্তাদের ওপর তিনি ক্ষমতার মারাত্মক অপব্যবহার করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন টিটিসির অধ্যক্ষদের ঢাকায় ডেকে নিজ দপ্তরে দরজা বন্ধ করে ‘রুদ্ধদ্বার বৈঠক’ করতেন তিনি। পছন্দের স্থানে পদায়ন, কেনাকাটার ফাইল অনুমোদন কিংবা প্রশাসনিক সুবিধার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের উৎকোচ দাবি করা হতো। অনৈতিক লেনদেনে রাজি না হলে দূরবর্তী ও দুর্গম এলাকায় বদলির হুমকি দেওয়া হতো।
---
লাইসেন্স জালিয়াতি ও প্রবাসীদের ফাইল আটকে চাঁদাবাজি
প্রবাসী কর্মীদের ছাড়পত্র দেওয়া ও রিক্রুটিং এজেন্সি তদারকি করার মতো স্পর্শকাতর দায়িত্বে বসে মাসুদ রানা দুর্নীতির জাল বিছিয়েছিলেন। নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রদান, তদন্ত রিপোর্ট ও সাধারণ প্রবাসীদের বহির্গমন ছাড়পত্রের ফাইলে কৃত্রিম জটিলতা সৃষ্টি করে নির্দিষ্ট কমিশন আদায় করা হতো। এছাড়া নিজের ভাইয়ের নামে নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্সির আড়ালেও সরকারি সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার করে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
---
কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও সম্পদ ক্রোকের চার দাবি
মাসুদ রানার দুর্নীতির আখড়া গুঁড়িয়ে দিতে এবং অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সংক্ষুব্ধ নাগরিকরা চার দফা জোর দাবি জানিয়েছেন:
- দাবি ১: মাসুদ রানা, তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের সকল সদস্যের ব্যাংক হিসাব অবিলম্বে ফ্রিজ করা এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও আয়কর নথি তলব করে বাজেয়াপ্ত করা।
- দাবি ২: বিএফআইইউ ও সিআইডির মাধ্যমে মালয়েশিয়া ও দুবাইয়ে পাচারকৃত অর্থের উৎস উদ্ঘাটন করে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যাংক হিসাব জব্দ করা।
- দাবি ৩: তথ্যপ্রমাণ ও আলামত নষ্ট বা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া রোধে আদালতের মাধ্যমে তাঁর বিদেশ গমনে তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা।
- দাবি ৪: মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের কঠোরতম ধারায় মামলা দায়ের করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।
রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সংস্থায় বসে এত বড় দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পরও বহাল তবিয়তে থাকা এই কর্মকর্তার বিষয়ে এখন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কী ব্যবস্থা নেয়, সেদিকেই নজর রাখছে দেশের সচেতন মহল।