অযত্ন আর অবহেলায় ধ্বংসের মুখে সূত্রাপুর জমিদার বাড়ি ও রূপলাল হাউজ
অযত্ন আর অবহেলায় ধ্বংসের মুখে সূত্রাপুর জমিদার বাড়ি ও রূপলাল হাউজ
পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে ছড়িয়ে আছে শত বছরের পুরোনো অসংখ্য স্থাপনা যা বিভিন্ন সময়ের ইতিহাসের নীরব সাক্ষ্য বহন করে। কিন্তু এসব স্থাপনা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সবসময়ই যথেষ্ট ঘাটতি লক্ষ করা যায়। এর মধ্যে অন্যতম হলো সূত্রাপুর জমিদার বাড়ি। প্রতাপশালী হিন্দু জমিদার রেবতী মোহন দাস বিশ শতকের গোড়ার দিকে এই বাড়িটি নির্মাণ করেন।
পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ আমলে এই বাড়ির মালিক হন তাঁর ছেলে জমিদার রায় বাহাদুর সত্যেন্দ্রনাথ কুমার দাস। তিনি ওয়াল্টার রোডে অনেকগুলো বিজলি বাতি স্থাপনের জন্য অর্থ প্রদান করেন। এ কারণে ওয়াল্টার রোডের একটি বিরাট অংশের নাম তাঁর পিতা রেবতী মোহন দাসের নামানুসারে রেবতী মোহন দাস বা সংক্ষেপে আর এম রোড রাখা হয়। কিন্তু দেশভাগের সময় জমিদার বাড়ির বংশধররা বাড়িটি ছেড়ে চলে যান এবং পরে এটি সরকারের তত্ত্বাবধানে চলে আসে।
পৃথক দুটি তিনতলা বিশিষ্ট ভবনের সমন্বয়ে তৈরি এই স্থাপনাটিতে অসাধারণ ফুলপাতার কারুকার্য রয়েছে যা ওই সময়ের স্থাপত্য শিল্পের চমৎকার নিদর্শন বহন করে। দক্ষিণের অংশটি বেশি প্রাচীন এবং এর প্রবেশমুখ প্রায় ৫০ ফুট উঁচু। ছাদটি তিনটি করিন্থিয়ান স্তম্ভের ওপর স্থাপিত। পুরো দালানের ভেতরে বিভিন্ন আয়তনের প্রায় ৩৫টি কক্ষ রয়েছে। অন্যদিকে উত্তর পাশের তিনতলা ভবনটি রেবতী মোহন দাসের কোনো এক আত্মীয় নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। এখানেও ৫০ ফুটের প্রবেশমুখ ও প্রায় সমানসংখ্যক কক্ষ রয়েছে।
কিন্তু বর্তমানে ভবনটি অত্যন্ত মলিন ও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এটি এখন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক এর রক্ষণাবেক্ষণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং মানুষের বসতি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করাও সম্ভব হচ্ছে না।
একইভাবে চরম অবহেলার শিকার পুরান ঢাকার ফরাসগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত উনিশ শতকের বিশাল অট্টালিকা রূপলাল হাউজ। ১৮২৫ সালে স্টিফেন আরাটুন নামের একজন আর্মেনীয় ব্যবসায়ী এটি নির্মাণ করেন। কিন্তু ১৮৪০ সালের দিকে ব্যবসায়ী রূপলাল দাশ ও তাঁর ভাই রঘুনাথ দাশ বাড়িটি কিনে নেন এবং এর নামকরণ হয় রূপলাল হাউজ। ছোট ব্যবসা দিয়ে শুরু করে রূপলাল সে সময় শহরের অন্যতম শীর্ষ ধনী হয়ে ওঠেন।
রূপলাল হাউজ প্রথম আলোচনায় আসে ১৮৮৬ সালে যখন রূপলাল দাশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের সম্মানে এখানে একটি বল ডান্স পার্টির আয়োজন করেন। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ও শিল্পীরা এখানে আসতেন যার মধ্যে কাজী নজরুল ইসলামের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তখনকার সময়ে ঢাকার বিলাসবহুল দুটি বাড়ির মধ্যে এটি ছিল অন্যতম।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর রূপলাল দাশের পরিবার কলকাতায় চলে যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬২ সালে একটি আনুষ্ঠানিক বিনিময় দলিলের মাধ্যমে সিদ্দিক জামাল বাড়িটি কিনে নেন। ইতিহাসের অমূল্য চিহ্ন বহনকারী এই অট্টালিকা আজ পরম অযত্ন আর অবহেলায় দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক দশকের খণ্ডিত মালিকানা আর সীমিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধসে পড়া দেয়াল ভেঙে পড়া সিলিং দেয়ালের চিড়ে জন্মানো আগাছা জংধরা লোহার নকশা আর ইট বেরিয়ে আসা দেয়ালগুলো সেই অবহেলারই করুণ সাক্ষী।
সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এর কিছু অংশের রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার পেলেও সম্পূর্ণ অংশ তাদের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। চারপাশে হকারের দখল ও অবৈধ দোকানপাট দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটি একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। এমন আরও অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা আজ ধ্বংসের মুখে। এখনই যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ধীরে ধীরে এসব স্থাপনা এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস চিরতরে হারিয়ে যাবে। রূপলাল হাউজ বা সূত্রাপুর জমিদার বাড়ির ধ্বংস শুধু কোনো ভবনের ধ্বংস নয় বরং এটি আমাদের উনিশ শতকের অমূল্য ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধ্বংস।
লেখক:
সামিয়া আক্তার, জবি।

-2021-08-29-21-21-25.gif)
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: